,


নাটোরের নিভৃতচারী লেখক অলোকা ভৌমিক

নাটোরের নিভৃতচারী লেখক অলোকা ভৌমিক

নাটোর প্রতিনিধিঃ নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইল গ্রামের বৃদ্ধা অলোকা ভৌমিক দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে একাগ্র চিত্তে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ গ্রন্থ লিখে চলেছেন।

গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২টি। দীর্ঘদিন অনেকের আগোচরে থাকলে সম্প্রতি তার লেখক সত্ত্বা প্রকাশিত হয়। স্বামী সন্তান, পরিবার পরিজন হারা অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই মানুষটির ঠাঁই হয়েছে আরেকটি অসাম্প্রদায়িক পরিবারে।

জানা যায়, ৭৩ বছর বয়সী আলোকা ভৌমিক বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়লেও মনের কাছে হার মানেননি। তাইতে দীর্ঘদিন ধরে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখে চলেছেন তিনি।

সংকটের জীবনে নানা প্রতিকূলতায় অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেছেন আজন্ম। যার ছাপ রয়েছে লেখার পরতে পরতে। মহানবীর জীবনী, রাধা কৃষ্ণ নিয়ে লেখা এবং নাটোরের রানী ভবানী ও রানী রাসমনীর জীবন কাহিনী অলোকা ভৌমিকের অনবদ্য সৃষ্টি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় আলোকা ভৌমিকের।

যাযাবর স্বামীর কড়া শাসন তার কোমল হৃদয়কে করেছিল ক্ষত বিক্ষত। পরবর্তীতে মৃত সন্তান জন্মদানের হাহাকার তাকে পেয়ে বসে প্রবলভাবে।

আলোকা ভৌমিক জানান, আমার মন যখন খুব খারাপ হয় তখন কে যেন আমার হাতে কলম খাতা তুলে দেয়। তখন আমি মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখি। মন শুধুই লিখতে তাগাদা দেয়। বিয়ের পর থেকেই আমার সংসারে খুবই অশান্তি ছিল। যাযাবর টাইপের স্বামী ঘরে থাকতো না। একাকিত্বে তখন লেখাকেই একমাত্র অবলম্বন হিসাবে বেছে নিই।

কখনোআমার স্বামী লেখালেখি করতে অনুপ্রেরণা দেননি। বরং বাধা প্রদান করেছেন প্রতিনিয়ত। তারপরও কাগজ কলম আর খাতাকে সঙ্গি করে চলছিল দিন।

তবে এতোটুকুও কপালে সয়নি। মৃত সন্তান জন্মদিবার পর শ্বশুরবাড়ির অনেক অপবাদ সইতে হয়েছে। এরই মাঝে বেকার স্বামী ভিটে মাটি বিক্রি করে দিলে ঘর ছাড়া হই। ১০ বছর হলো স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর ক্রেতা হামিদার বাড়িতেই আশ্রয় পাই। ধর্ম বর্ণ গোত্র ভিন্ন হলেও এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন হামিদা। মায়ের মমতায় যত্ন করাসহ লেখার জন্য কাগজ, কলম কিনে দেয় সে।

অলোকা ভৌমিককে পরম মমতায় আগলে রাখা হামিদা বেগম জানান, অত্যন্ত সজ্জন ও মিশুক প্রকৃতির আলোকা ভৌমিক। দরিদ্রতার মাঝেও তিনি সাহিত্য চর্চা করছেন এবং সবাইকে বই পড়তে উদ্বৃদ্ধ করছেন। আমার বাবা মৃত্যুর আগে আদেশ করে গিয়েছিল তাকে দেখে রাখতে। তারপর থেকে আমি তাকে দেখে রাখি। কোনও অযত্ন হতে দেই না। সাথে করে বিভিন্ন স্থানে সাহিত্য অনুষ্ঠানে নিয়ে যাই।

ইতিহাসবিদ ও লেখক খালিদ বিন জালাল বাচ্চু বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকেও আলোকা ভৌমিকের সাহিত্য চর্চা বাংলার সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে যা অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার মাধ্যমে এই নিভৃতচারী লেখকের সৃষ্টিকর্ম প্রকাশ ও সুন্দর জীবন যাপনে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ বলেন, যতোটুকু জানতে পেরেছি, ১৯৪৭ সালের ১০ জানুয়ারি নাটোর জেলার শ্রীরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অলোকা ভৌমিক।

সেসময় মেয়েদের লেখাপড়ার পরিবেশ ও সুযোগ না থাকায় প্রাথমিকের গন্ডি পেরুতে পারেননি তিনি। তারপরও তিনি স্বশিক্ষিত হয়ে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখে তা প্রকাশ করেছেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। সবাইকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এটি একটি বিরল ঘটনা।

ইতিমধ্যে অলোকা ভৌমিকের ১২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাকি অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশ ও তার জীবনমান উন্নয়নে জেলা প্রশাসন থেকে উদ্যোগ গ্রহন করা হবে।

Leave a Reply


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: