,


নাটোরে অর্ধশতাধিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারের বেশিরভাগই ভূয়া

নাটোরে অর্ধশতাধিক ফিজিওথেরাপি সেন্টারের বেশিরভাগই ভূয়া

নাটোর প্রতিনিধিঃ নাটোর জুড়ে নির্বিঘেœ চলছে ভুয়া ফিজিওথেরাপিস্টদের রমরমা চিকিৎসা বাণিজ্য। এখানে মাত্র ৪ জন রেজিস্টার্ড ফিজিওথেরাপিস্ট থাকলেও কার্যক্রম চলছে জেলার অর্ধ শতাধিক সেন্টারে। বিশেষ করে নাটোর শহরে স্বাস্থ্য বিভাগের নাকের ডগায় তিনটি প্রতিষ্ঠানে নির্বিঘেœ চলছে ভূয়া ফিজিওথেরাপিস্টদের রমরমা চিকিৎসা বাণিজ্য। বর্তমানে ফিজিওথেরাপির আধুনিক চিকিৎসা সেবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় প্যারালাইসিস, আর্থ্রাইটিস, বাত-ব্যথাসহ অনেক রোগের চিকিৎসার গুরুত্ব বাড়ছে। একই কারণে বাড়ছে রোগীর সংখ্যাও। বর্তমানে নাটোরে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। রোগী বৃদ্ধির এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাইনবোর্ডের মাধ্যমে চলছে অপচিকিৎসা। ভূয়া ফিজিওথেরাপিস্টদের খপ্পরে পড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে অনেক রোগীকে। এরপরও এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়েনি।
অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতরের নীতিমালা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ডিগ্রিধারীরাই ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে নাটোরসহ ঢাকা, রাজশাহী এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৩টি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং ৪টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পেশাগত ¯œাতক ফিজিওথেরাপি শিক্ষা ডিগ্রি- বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি কোর্স চালু রয়েছে। ¯œাতক ডিগ্রি পাস করতে ১ বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নিশিপসহ ৫ বছরে শিক্ষার্থীদের মোট ৫৩৫০ ঘণ্টার পড়াশোনা করতে হয় এবং ৬২৫০ মার্কসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিআরপিতে এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসএস ইন ফিজিওথেরাপি নামে ¯œাতকোত্তর ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি চালু আছে। যেখানে পড়াশোনা করে তারা বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট হতে পারেন। এছাড়া দেশের প্রায় সকল আইএসটিতে ফিজিওথেরাপির উপর ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন হেলথ টেকনোলজি কোর্স চালু আছে। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী এ হেলথ টেকনোলজিস্টরা ফিজিওথেরাপিস্টদের সহকারী হিসেবে কাজ করার কথা বলা থাকলেও নাটোরে হয়েছে উল্টো। রোগী বৃদ্ধির এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুরো জেলায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী এ হেলথ টেকনোলজিস্টরা ফিজিওথেরাপিস্ট পদবী লিখে ভূয়া সাইনবোর্ডে চালাচ্ছে রমরমা প্রতারণা বাণিজ্য ।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, নাটোরে বর্তমানে রেজিস্টার্ড ৪ জন বিপিটি (ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি) ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিস্ট থাকলেও অর্ধ শতাধিক সেন্টার কার্যক্রম চালাচ্ছে শুধু টেকনিশিয়ান ও টেকনিশিয়ানদের সহকারী দিয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাটোর ষ্ট্রোক সেন্টার, নাটোর ফিজিওথেরাপি এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার এবং রিলাক্স ফিজিওথেরাপি সেন্টার নামে এ তিনটি সেন্টারে চিকিৎসার নামে চলছে অপচিকিৎসা।
সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে নাটোর ষ্ট্রোক সেন্টার । গত দুই যুগের বেশি সময় ধরে কোন প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও নিজেকে ফিজিওথেরাপিষ্ট হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে রমরমা প্রতারণা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে রবিউল আলম মহিত । প্রথম সাক্ষাতে রোগীকে দিতে হচ্ছে তিনশ টাকা ও দ্বিতীয় সাক্ষাতে দিতে হচ্ছে রোগী প্রতি দুইশ টাকা । কমিউনিটি ষ্ট্রোক ফাউন্ডেশনের ফিজিওথেরাপিষ্ট হিসেবে পরিচয় দিলেও তিনি কোন কাগজ দেখাতে পারেনি। রবিউল ইসলাম মহিত জানান, তাঁর মেয়ে এবং শ্যালিকা দুইজন ফিজিওথেরাপিতে বিপিএড করেছে । তারা ঢাকায় থাকেন। মাঝে মাঝে নাটোর এসে এখানে বসে চিকিৎসা দেন । তিনি ভালো চিকিৎসা করেন বলে জেলা জজ, সিভিল সার্জনসহ অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন । রবিউল আলম মুহিতের কোনো ডিগ্রি নেই। টেকনিশিয়ান থেকে এখন ফিজিওথেরাপিস্ট পরিচয় দিয়ে রোগীদের সাথে প্রতারণা করছে
শহরের মাদ্রাসা মোড়ে রিলাক্স ফিজিওথেরাপির সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় , একই ঘরের ঘিঞ্জি পরিবেশে চিকিৎসা এ প্রতিষ্ঠানে রোগীদের ফিজিওথেরাপি দিচ্ছেন নাছির উদ্দীন নামের এক যুবক।
নাছিরের সাথে কথা হলে তিনি জানান, তিনি কোনো ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিস্ট না। তিনি একজন ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী এ হেলথ টেকনোলজিস্ট বা টেকনেশিয়ান । নামের আগে আইনগতভাবে তিনি ফিজিওথেরাপিষ্ট লিখতে পারেন কিনা জানতে চাইলে আমতা আমতা করে বলেন, তিনি ফিজিওথেরাপিষ্ট নন এটা সত্যি। তিনি দিব্যি রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসাসেবা বা স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন । রোগী প্রতি তিনি দুশ টাকা নিয়ে থাকেন। আর সেই দুশ টাকা থেকে একশ টাকা দিতে হয় অর্থপেডিক্সের ডাক্তারদের । এখানে নাছিরকে ওয়াক্সবাথ মেশিনের বদলে রাইস কুকারে মোম গলিয়ে রোগীদের অভিনব পদ্ধতিতে চিকিৎসা থেরাপি দিতে দেখা যায়।
একই অবস্থা শহরের স্টেশন বাজার এলাকার নাটোর ফিজিওথেরাপি এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার নামের প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা ও ফিজিওথেরাপি দিচ্ছেন আব্বাস আলী। তিনি ফিজিওথেরাপি টেকনিশিয়ান হলেও বিশাল সাইনবোর্ডে নিজেকে ফিজিওথেরাপিষ্ট আব্বাস আলী বলে পরিচয় দিয়েছেন। ছোট একটি কক্ষে নারী-পুরুষকে একত্রে চিকিৎসা দিচ্ছেন । এখানে রোগী প্রতি আদায় করা হচ্ছে দুইশ টাকা করে। এখানে গিয়ে আব্বাস আলীকে পাওয়া যায়নি । আকাশ নামের এক কিশোরকে চিকিৎসা দিতে দেখা যায় । আকাশের সাথে কথা হলে তিনি জানান, তিনি কোনো ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপিষ্ট না। আব্বাস ভাই বাহিরে থাকায় অবর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি করাচ্ছেন। তিনি কলেজ ছাত্র। আইনগতভাবে তিনি ফিজিওথেরাপি করাতে পারেন কিনা জানতে চাইলে আমতা আমতা করে বলেন, তিনি ফিজিওথেরাপি করান না ।
এভাবে অসংখ্য সেন্টারে চিকিৎসার নামে চলছে অপচিকিৎসা। নিকট অতীতে কোন অভিযান চালানো হয়নি এসব সেন্টারের বিরুদ্ধে । অথচ বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করে পাঁচ বছরের অনার্সসহ পিটি ডিগ্রি ছাড়া ফিজিওথেরাপি দেয়ার কোনো বিধান নেই। এরপরও প্রশাসনের সামনে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে ফিজিওথেরাপিস্টরা। তারা দালালের মাধ্যমে স্বল্প সময় ও অল্প টাকায় রোগীদের ভালো করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে রোগী তো সুস্থ হচ্ছেই না, উল্টো আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
নাটোরের সিভিল সার্জন আজিজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ ধরনের ফিজিওথেরাপি সেন্টার স¤পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে অতি দ্রুত অদের আইনের আওতায় আনা হবে।

Leave a Reply


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: