,


বাস কেড়ে নিয়েছে মেয়েকে, তাই বাস চালানোই ছেড়েছেন বাবা

বাস কেড়ে নিয়েছে মেয়েকে, তাই বাস চালানোই ছেড়েছেন বাবা

ডেস্ক রিপোর্টারঃ  মেয়ে মায়ের কাছ থেকে চলে গেছেন অনেক দূরে। কিন্তু মা তাকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। মেয়ের পোশাক, বই-খাতা, ছবি নিয়ে দিন কাটে মায়ের। প্রতিদিন ঠিক আসরের নামাজ পড়ে মা হাজির হন মেয়ের কাছে। মা কবরের সামনে নীরবে চোখের জল ফেলেন। মা চেয়ে থাকেন কিন্তু মেয়ে আর সাড়া দেয় না। ঠিক এক বছর আগে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হওয়া শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিমের মা রোকসানা বেগমের দিন এখন এভাবেই কাটে।

শোয়ার ঘরের একপাশে রোকসানা বেগম দিয়ার ব্যবহার্য সব জিনিস আলাদা করে রেখেছেন একটি আলমারিতে। সেই আলমারির থাকে থাকে মেয়ের পোশাক, কলেজের পরিচয়পত্র, জুতা, বই খাতা। মেয়ের কথা বলতে বলতে বারবার ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পেশায় বাসচালক। কিন্তু মেয়েকে বাস চাপা দেওয়ার পর কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেছিলেন, ‘যে বাস আমার মেয়েরে চাপা দিল, সেই বাস আর আমি চালামু না।’ দিয়ার বাবা তাঁর কথায় অটল থেকেছেন। বাস চালানো ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এখন মহাখালী বাস টার্মিনালের পাশে চা-নাশতার দোকান দিয়েছেন তিনি। তার একটাই চাওয়া, সরকারের লোকেরা যেন ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে চালকের হাতে লাইসেন্স দেন। টাকা নিয়ে যেন সবার হাতে হাতে লাইসেন্স না দেওয়া হয়।

রোকসানা বেগম বলছিলেন, ‘মেয়েটা আমার অন্য দুই ছেলেমেয়ের থেকে আলাদা। আমার মন একটু খারাপ হলেই পাশে এসে জিজ্ঞাসা করত, “মা তোমার কী হয়েছে?” এমন একটা কথা বলত আর মুখ ভার করে থাকতে পারতাম না। সবাইকে আনন্দ দিত দিয়া। ওরা দুই বোন ছিল আমার দুই হাত। এখন দিয়া চলে গেছে, আমার এক হাত কাটা পড়ছে।’ দিয়ার মা কান্না চেপে রাখতে পারলেন না। চোখ মুছতে মুছতেই বলছিলেন, ‘এখন ওর কথা চিন্তা করেই আমার সারাটা দিন কাটে। একটা বছর চলে গেল মেয়ে আমার নাই। কিন্তু আমি তো ওরে ছাড়া থাকতে পারি না। প্রতিদিন আসরের নামাজ শেষ ওর কবরে যাই। যত ঝড় হোক বৃষ্টি হোক, ওর কাছে না গেলে আমার শান্তি লাগে না। মেয়ের কবরের দিকে চেয়ে থাকি, মেয়ে আমার সাড়া দেয় না।’ রোকসানা বেগম আর বেশি কথা বলতে পারলেন না।

দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলতে গেলে ঘরে বসতে দিলেন তিনি। বসার ঘরেই দিয়ার বাঁধাই করা বড় একটি ছবি ঝুলছে। বাবার মোবাইলের ওয়ালে দিয়ার ছবি রেখে দিয়েছেন। মেয়েকে প্রতি পদে পদে মনে পড়ে তাঁর। মেয়ে হারানো এই বাবা মেয়ের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন। মেয়েকে কাছে রাখতে তাই মেয়ের কবরও দিয়েছেন মহাখালী রহিম মেটাল মসজিদের পাশের কবরস্থানে।

জাহাঙ্গীরের কাছে মেয়ে দিয়ার জন্য আলাদা জায়গা আগেও যেমন ছিল, এখনো তা আছে। তিনি বলছিলেন, ‘আমি যখন বাড়ি থেকে বের হতাম মেয়েটা আমাকে সালাম দিত। সে বাড়ি থেকে বের হলে সালাম দিয়ে যেত। আমি পেশায় চালক। আয়–রোজগার কম কিন্তু মেয়েদের আবদার কখনো বাকি রাখি নাই। যখন যা চাইছে দিছি। মেয়েটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল।’
স্মৃতিকাতর জাহাঙ্গীর মেয়ের স্মৃতি খোঁজেন এখনো। তিনি বলেন, ‘মেয়ের স্কুলে যাই। মেয়েটাকে যে জায়গায় বাস চাপা দিয়েছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াই। বুকটা হাহাকার করে ওঠে।’ জাহাঙ্গীর চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘মেয়েটাকে যেভাবে জাবালে নূর বাস চাপা দিয়েছে, সেটা দুর্ঘটনা না। এটা হত্যা। আর মামলা চলছে দুর্ঘটনার। আমি এখন দিন গুনতাছি কবে ওই বেপরোয়া চালকদের বিচার হইব। মামলা শুরু হইছে, আমি চাই ঘাতকদের বিচার হউক। মেয়ের আত্মাটা শান্তি পাইব, আমরাও শান্তি পামু।’

মেয়ের স্মৃতি ছিল যে বাড়িতে, সেই বাড়িতে তিনি থাকতে পারেন না। তাই বাসাও বদল করেছেন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘যে বাসের ড্রাইভার আমার মেয়েরে মারছে, ওরা ড্রাইভারগো মানসম্মান নষ্ট করছে। আপনি দেখেন যারা দক্ষ ও সিনিয়ার ড্রাইভার, তারা বেশি দুর্ঘটনা ঘটায় না। কিছু পোলাপান বাস চালাইতে জানে না। হালকা যানের লাইসেন্স নিয়া ভারী যান চালায় ওরাই বেশি দুর্ঘটনা ঘটায়।’

ঢাকার রাস্তায় এখনো শৃঙ্খলা আসেনি, এ নিয়ে আক্ষেপ করে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘দিয়ার মৃত্যুর পর ছাত্ররা রাস্তায় নামলো, রিকশা, কার, বাস চলার আলাদা লেন করে দিল। কত আন্দোলন হইল, এখন আর তা নাই। অথচ এটা হইলে ঢাকায় দুর্ঘটনা কমে আসতো।’
মেয়েরে স্মৃতি ধরে রাখতে দিয়ার স্কুলেই এখন ছেলে রিয়াদুল ইসলামকে ভর্তি করে দিয়েছেন জাহাঙ্গীর। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। আর আরেক মেয়ে রোকেয়া কানন রিয়া এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ত। আবেগাপ্লুত হয়ে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘মেয়ে বেঁচে থাকলে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে উঠত। এখন এমন জায়গায় গেল আর কোন দিন আইবো না। আমারে আর কোন দিন সালাম দিব না।’

সুত্রঃ প্রথম আলো 

Leave a Reply


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: