,


বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা আছেন চরম কষ্টে 1

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা আছেন চরম কষ্টে

নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জে এবার বন্যায় ও নদীভাঙনে ৩ লাখ ৪২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর মাছ ভেসে গেছে ৫ কোটি ১ লাখ টাকার। ধান, পাটসহ প্রায় ১৩৬ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এতে দুই জেলার ১ লাখ ১৮ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। পানিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ভেসে যাওয়ায় কৃষকের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিন বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ করেছিলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার দাসপাড়া গ্রামের কৃষক পরিমল চন্দ্র। কিন্তু ১৬ জুলাই আত্রাই নদের বাঁধ ভেঙে হঠাৎ পানি এসে তাঁর খেতের সব ধান তলিয়ে যায়। খেতের ধান আর ঘরে তোলার কোনো পথ নেই। অথচ এই ধান দিয়ে অন্তত তিন মাস তাঁর সংসার চলত; পরিশোধ করতেন ঋণের টাকা।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বন্যায় নওগাঁর তিনটি উপজেলায় ৩ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমির আউশ, পাট, আমন বীজতলা, আখ, ভুট্টা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ১৬ ও ২০ জুলাই নওগাঁর মান্দা ও রানীনগর উপজেলায় আত্রাই ও ছোট যমুনার বাঁধ ভেঙে ২ হাজার ৯৬৫ হেক্টর ফসল তলিয়ে যায়। এতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে গত শনিবার আত্রাই উপজেলায় আত্রাই নদের বাঁধ ভেঙে নতুন ৪৫০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তলিয়ে যাওয়া ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ১১-১২ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ দুই দফা বন্যায় প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত বন্যায় প্রায় ২৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ক্ষতিগ্রস্ত গরুর খামারির সংখ্যা ১ হাজার ৪২৪ জন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য কোনো ত্রাণসহায়তা আসেনি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উত্তম কুমার দাস বলেন, নওগাঁয় বন্যার পানি নেমে যেতে শুরু করায় অনেক চারণভূমি জেগে উঠেছে। ফলে বন্যায় আক্রান্ত এলাকার গবাদিপশুর যে তালিকা করা হয়েছিল, সেগুলোকে এখন আর বন্যাদুর্গত বলা যাবে না। এ জন্য তালিকা পাঠালেও পরে আর ত্রাণসহায়তা নেওয়া হয়নি।

এদিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ভাটপিয়ার বাঁধে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্ধশতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এই বাঁধে আশ্রয় নিয়েছিলেন স্থানীয় আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, ‘১২ দিন বাঁধের ওপর গরু-ছাগলের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার পর গত রোববার সকালে বাড়ি গেছি। বানের পানিতে লন্ডভন্ড ঘরে ঘুমানো তো দূরের কথা, বসার ব্যবস্থাও নেই। তাই কী করবো বুঝতে পারছি না।’

বন্যাকবলিত ভাটপিয়ার ও রনীগ্রাম এলাকার কিছু পরিবার বিদ্যালয় ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে একজন লিয়াকত ব্যাপারী বলেন, ‘প্রতিবছরই বন্যায় আমাদের এই হাল হয়। বছর ঘুরে জমানো সঞ্চয় দিয়ে বন্যার পর আবারও নতুন করে সংসার গোছাতে হয়। যাদের একটু সামর্থ্য আছে, তারা ঘরবাড়ি ঠিক করতে পারে।’ এ সময় গৃহিণী রেশমা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘বন্যার সময় আমাদের দেখার কেউ নেই, আবার বন্যার পরেও আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না।’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বন্যায় ও নদীভাঙনে গত দেড় সপ্তাহে তিন লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ হাজার ৪০৪ জন। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ হাজার ১৭৭ জন। জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভায় ৪০০টি গ্রাম সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪ জন। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সংখ্যা ৫০ হাজার ৩১৮।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল হক বলেন, বন্যায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে আউশ, রোপা আমন ধানের জমি, পাট, কলা, ভুট্টা, আখ ও শাকসবজির বীজতলা রয়েছে। এবারের বন্যায় এ পর্যন্ত জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ৯২ হাজার কৃষক পরিবারের প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, ‘বন্যায় জেলায় ৭৬ হাজার গবাদিপশু পানিবন্দী হয়ে পড়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা ত্রাণসহায়তা চাইনি। তবে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যানের দেওয়া ছয় টন গোখাদ্য আমাদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। বন্যায় জেলার গোখামারিদের ৭৫ লাখ টাকার সবুজ ঘাস নষ্ট হয়েছে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাহেদ আলী বলেন, বন্যায় জেলার ৩১৪ জন মৎস্য খামারির ১১৩.১৪ হেক্টর আয়তনের ৩৪২টি পুকুরের ৯৯.৬৫ মেট্রিক টন মাছ ও ১ কোটি ২৭ লাখ মাছের পোনা ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘এবারের বন্যায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫টি রাস্তা এখনো পানির নিচে। এর মধ্যে তিনটি রাস্তা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

Leave a Reply


এই বিভাগের আরো

সর্বশেষ

%d bloggers like this: